স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে সবুজ বিপ্লবের বিকল্প নেই // লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবের সদস্য, যুুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক দেওয়ান রফিকুল হায়দার (ফয়সল)

প্রকাশিত: ৮:২৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২১

স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে সবুজ বিপ্লবের বিকল্প নেই // লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাবের সদস্য, যুুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক দেওয়ান রফিকুল হায়দার (ফয়সল)

সিলেটের নিউজ টুয়েন্টিফোরঃ
বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এই বাংলাদেশের মাটিতে ধান, পাট,ফলমূল, তরিতরকারী সবকিছুই উৎপন্ন করা যায় অতি অল্প পরিশ্রমে। আমাদের দেশের মানুষ যে কর্মঠ এবং ভীষণ পরিশ্রমী সে কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে। প্রায় প্রতি বছরই সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় ধান এবং তরিতরকারীর বাম্পার ফলন হওয়ার কথা। কিন্তু দু:খের বিষয়, যে বছরই বাম্পার ফলন হওয়ার খবর প্রকাশিত হয় সে বছরই দেখা যায়, কৃষকের মাথায় হাত! যেখানে কৃষকের খুশী হওয়ার কথা, সেখানে কৃষকের মাথায় হাত কেন? এ প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই মনের মধ্যে উঁকিঝুকি মারতে থাকে। ধান বা তরিতরকারী কৃষকেরা বিক্রি করতে গেলে দেখা যায়, ফসল উৎপাদনে তাদের যে খরচ হয়েছে তা থেকে অনেক কমদামে তাদের বিক্রি করতে হচ্ছে। এর কারণ কি? এর কারণ হচ্ছে কৃষকরা একদল সিন্ডিকেটের হাতে বন্দী। খবর নিয়ে জানা গেছে, ফসলের ভাল উৎপাদন দেখে আগে থেকেই এসব মুনাফাখোর সিন্ডিকেটের দল ফসলের দাম কমিয়ে দেয়। তারা শুধু তাদের লাভের অংশটাই বড় করে দেখে। তারা কম দামে কৃষকের কাছ থেকে কিনে নিয়ে মজুদের ভান্ডার গড়ে তোলে। এরপর যখন ফসল তোলার সময় শেষ হয়ে যায় তখন চড়া দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করে। শুধু ধানই নয়, ফলমূল এবং তরতরকারীর ব্যাপারেও একই অবস্থা। গত বছর দেখা গেছে মিষ্টি লাউ এবং তরমুজ সারা দেশে প্রচুর পরিমানে ফলন হলেও বিক্রি করার সময় তারা ন্যায্যমুল্য পায়নি। অনেক কৃষক তাদের ফসলের নায্যমুল্য না পাওয়ায় মনের দু:খে ্েক্ষতের মধ্যেই ফলগুলো নষ্ট করে ফেলেছে। এই অবস্থা দেখে মনে হয় যেন, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যে কৃষকরা ফসল ফলায় তারা যেন মুনাফাখোর সিন্ডিকেটদের হাতে বন্দী। সিন্ডিকেটরা যা বলবে তা-ই তাদের শুনতে হবে। এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? দায়ী হচ্ছে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়। কারণ, এ ব্যাপারে সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। বাংলাদেশ জন্মের ৫০ বছরেরও উপর হয়ে গেলো অথচ আমরা কৃষি বিপ্লব ঘটাতে পারলামনা, এর থেকে আর দু:খের বিষয় কি হতে পারে। সিন্ডিকেট মুনাফাখোরদের হাত থেকে আমাদের কৃষক সমাজকে রক্ষা করতে পারলাম না, এ দু:খ কোথায় রাখি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন দেশটি ছিলো একেবারেই অচল। রাস্তাঘাট, ভাঙ্গাচুরা যানবাহন, বাংলাদেশ ব্যংকের রিজার্ভ শূন্য অর্থাৎ একটা দেশ চালানোর মতো কিছুই ছিলো না। সেই অবস্থায়, দূরদর্শী চিন্তাধারার অধিকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, দেশের মানুষের জন্য প্রথমেই ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতে হবে তাই তিনি কৃষি খাতের উপর গুরুত্ব দিয়ে সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমার কুষকরা যদি বাঁচে বাংলাদেশ বাঁচবে, বাংলাদেশের মানুষ না খেয়ে মরবেনা।” তাই তিনি কৃষকদের কমমূল্যে সার বিতরণ সহ বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা দিতে শুরু করেছিলেন্। আজ যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন তাহলে সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে বাাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে একটি আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে পারলেন না, বিশ্বাস ঘাতকেরা ১৯৭৫ সালের ১৫্ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে (শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে গেছেন) হত্যা করে। যে ভাবে বাংলা-বিহার ওড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালে তাঁর সেনাপতি মীরজাফর, রায়দুর্লভ এর বিশ্বাস ঘাতকতা করার কারণে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন এবং রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইষ্ট ইন্ডিয়্ াকোম্পানী বাংলার শাসন ভার গ্রহণ করে। সেদিন থেকে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য্য অস্তমিত হয়। সেই বিশ্বাস ঘাতকের বংশধরেরা আজও বাংলাদেশের মাটিতে সক্রিয় হয়ে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে এবং দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দেশ বিদেশ থেকে কাজ করে যাচ্ছে। এসব বিশ্বাস ঘাতকদের প্রতি সরকারের কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।
আমরা যতোই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করিনা কেন, দেশকে যদি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে না পারি তাহলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে খুবই কঠিন। পেটে যদি খাবার না থাকে, তা হলে ফ্যাসন মোশন কতদিন চলবে। আজ কেন দেশের গরীব অসহায় মানুষ সরকারের দেয়া সাহায্যের একমুটো চালের জন্য প্রখর রৌদ্র বা অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে ভিজে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে? এমনটা হওয়ার কথা ছিলোনা। প্রতিবছর দেশের যে কোটি কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়, তা থেকে কৃষিখাতের জন্য যে বাজেট দেয়া হয় তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। তা দিয়ে কোনদিনই কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়। সোজা কথা, যতদিন পর্য্যন্ত কৃষিখাতকে দেশের বাজেটে অগ্রাধিকার না দেয়া হবে ততদিন পর্য্যন্ত বাংলাদেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবেনা।
সম্প্রতি একটি পত্রিকার খবরে প্রকাশ, “করোনা মহামারীর মধ্যেই ১০০ কোটি ডলার রপ্তানী আয়ের মাইল ফলকে পৌছে গেছে কৃষিপণ্য। বিদায়ী অর্থ বছরে বাংলাদেশ থেকে ১০২ কোটি ৮১ লাখ ডলারের কৃষিপণ্য রফতানী হয়েছে। তার মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্যের হিস্যাই বেশি। রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১০ বছর আগেও কৃষিপণ্যের রপ্তানী আয় ছিলো মাত্র ৪০ কোটি ডলার। যদিও করোনার কারণে ২০১৯ থেকে ২০ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানী ৫ শতাংশ কমেছিলো। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে খাতটির রপ্তানী আয় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে রপ্তানী হয় রুটি, বিস্কুট ও চানাচুর জাতীয় শুকনা খাবার, ভোজ্যতেল ও সমজাতীয় পণ্য, ফলের রস, বিভিন্ন ধরণের মসলা, পানীয় এবং জ্যাম-জেলির মতো বিভিন্ন সুগার কনফেকশনারী। শুধুমাত্র বিস্কুট, রুটি জাতীয় শুকনো খাবার রপ্তানী করে বিদায়ী অর্থ বছরে দেশীয় কোম্পানীগুলো ২৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করেছে। তার বাইরেও চা, শাকশব্জি ও ফলমূলও রপ্তানী হয়েছে।”
উপরের এই সংবাদটি বাংলাদেশের রপ্তানী বাজারের জন্য একটি সুখবর। উপরে উল্লেখিত কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যগুলো উৎপাদনে যদি বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের দেশে গিয়ে টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হতো তাহলে এই উৎপাদন খাত আরও বৃদ্ধি পেতো। যার অর্থ হচ্ছে, রপ্তানী খাতের আয় দ্বিগুণ হতো। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রবাসীরা দেশে গিয়ে কোন ব্যবসা করতে হাত দিলেই সিন্ডিকেটের লোকেরা তাদেরকে কি ভাবে কব্জা করে টাকাগুলো তাদের পকেটে ঢুকানো যায়, সে ব্যবস্থায়ই তারা থাকে। পরে তাদের টাকাগুলো গচ্ছা দিয়ে প্রবাসীরা দেশ থেকে পালিয়ে আসেন। এভাবেই প্রবাসীরা দেশে গিয়ে ব্যবসা বানিজ্য করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন। প্রবাসীদের দেশে গিয়ে ব্যবসা করায় উৎসাহী করতে সরকার যদি এমন কোন পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারে, যাতে প্রবাসীরা নির্ভয়ে বাংলাদেশে গিয়ে যে টাকা বিনিয়োগ করবে তার একটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা, বিভিন্ন ভাবে হয়রানীর সম্মুখীন যাতে না হতে হয় তার নিশ্চয়তা দিতে পারে, তাহলে হয়তো তারা দেশে গিয়ে বিনিয়োগ করার উৎসাহ পেতে পারেন। যার ফলে দেশের যেমন লাভ হবে তেমনি লাভবান হবেন যারা দেশে গিয়ে বিনিয়োগ করবে সেই প্রবাসীরাও।
তবে একথা সত্য, একটা দেশ চালাতে গেলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশ চালাতে হয়, আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমেই যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। যার ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নতমানের হয়েছে। মানুষ বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে॥ এছাড়াও ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রেও অনেক সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের এখন উচিৎ, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কৃষিখাতের উন্নয়নের জন্য সবুজ বিপ্লবের কর্মসুচী গ্রহণ করে কাজ শুরু করে দেয়া। বর্তমানে বাংলাদেশ যে ভাবে একটি ভালো আবস্থানে আছে তা দেশবাসী ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছে। এখন শুধু দরকার কৃষি বিপ্লব বাস্তবায়ন করে দেশের মানুষের অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করা। তাহলেই আমরা বলতে পারবো- সুজলা সুফলা আমাদের এই বাংলাদেশ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

shares